কমলগঞ্জ সংবাদদাতা :
বর্তমানে ফাল্গুন মাস চলছে, আর গ্রাম বাংলার প্রতিটি কোণে ফুলের সুবাস ভেসে আসছে। চারপাশে পাখির সুরেলা গান, কুকিলের কুহু কুহু ডাক, এবং বিভিন্ন প্রজাতির পোকার উড়াউড়ি যেন এক মুহূর্তে শৈশবে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি এনে দেয়। তবে, বৃষ্টির ফোটার কোনো দেখা নেই, এবং চৈত্র মাসের আগমন প্রায় নিশ্চিত। চৈত্র মাসে বাংলার শুষ্ক মৌসুমে পানি স্তর নিচে নেমে যায় এবং হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যেতে থাকে।
এ বছর পানির অপচয়, বোরো ধান আবাদ বাড়ানো, খাল-বিল ও পুকুর শুকিয়ে ফেলা, এবং নলকূপের অপরিকল্পিত ব্যবহারসহ নানা কারণে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটের কারণে গ্রাম বাংলার বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরার পরিসর ছোট হয়ে আসছে, বিশেষ করে কমলগঞ্জ উপজেলার গ্রামাঞ্চলে এখন মাছ ধরার ধুম চলছে।
কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গ্রামবাসীরা সেচের মাধ্যমে খাল-বিল ও পুকুর থেকে মাছ ধরছেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘খাইঞ্জা’ নামে পরিচিত। ‘খাইঞ্জা হিছা’ বা সেচের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে তলানিতে মাছের লাফালাফি দেখা যায়। শীতের শেষ থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত এ ধরণের মাছ ধরার প্রক্রিয়া চলে। দিনের বিভিন্ন সময় গ্রামবাসীরা জলাশয় থেকে মাছ ধরতে দেখা যায়।
এ অঞ্চলের শৌখিন মাছশিকারীরা ডমকী দিয়ে পানি সেচে মাছ ধরছেন, যার মধ্যে বেশিরভাগ মাছ ছোট ও ডিমওয়ালা দেশি মাছ। বড় মাছ খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে, স্থানীয় যুবক অমিত দেবনাথ জানান, পানির স্তর কমে যাওয়ায় মাছ ধরার কার্যক্রম বাড়িয়ে দিয়েছেন। পুঁটি, মলা, টাকি, টেংরা, কই মাছ পাওয়া যাচ্ছে বেশি।
যোগীবিলের ঐতিহ্যবাহী “খাইঞ্জা” দইপুকুরে মেশিন দিয়ে পানি শুকানোর পাশাপাশি হাতে মাছ ধরার নানা উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। শিশু-কিশোররা খাল-বিলে নেমে খালি হাতে মাছ ধরছে। এ অঞ্চলে দেশি মাছ যেমন কৈ, মাগুর, শিং, টাকি, ট্যাংরা, বাইম, বাইম চিক্রি, পুঁটি, মখা, শোল, গজার, আইড় ইত্যাদি বেশি ধরা পড়ছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “শুকনো মৌসুমের কারণে জলাশয় ও খাল-বিলে মাছ ধরার পরিমাণ বেড়েছে। তবে, মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির অভাবে দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বর্তমানে হাওর আর হাওর নেই, হাওরগুলো কৃষিজমিতে পরিণত হয়েছে।”
এভাবে, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘খাইঞ্জা’ পদ্ধতিতে মাছ ধরার ধুম তো চলছে, কিন্তু একইসঙ্গে পানির সংকট এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে দেশীয় মাছের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগও দেখা যাচ্ছে।
Leave a Reply