বগুড়া সংবাদদাতা :
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনগর শিবমন্দিরকে ঘিরে বসেছে ৪০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গাংনগর মেলা। উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হওয়া এই মেলাকে কেন্দ্র করে আশপাশের অর্ধশতাধিক গ্রামে বিরাজ করছে আনন্দ-উৎসবের আমেজ। বৈশাখ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার থেকেই শুরু হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রথম সোম বা বৃহস্পতিবার (যেটি আগে আসে) বসে গাংনগরের এই মেলা। এবছর বৃহস্পতিবার হওয়ায় সেই দিন থেকেই শুরু হয় মেলার আনুষ্ঠানিকতা। মেলা উপলক্ষে আশপাশের গ্রামের মেয়েরা স্বামী-সন্তানসহ বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন, আত্মীয়-স্বজনেরও আগমন ঘটেছে নিমন্ত্রণে।
শনিবার (১৯ এপ্রিল) সকাল থেকে মেলা ঘুরে দেখা যায়, শিবগঞ্জ উপজেলার গাংনগর মন্দির থেকে শুরু হয়ে বিদ্যালয় মাঠ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মেলার পরিধি। যদিও মেলার আগের সেই জৌলুস কিছুটা কমেছে, তারপরও রয়ে গেছে ঐতিহ্যের ছাপ। বাহারি রসগোল্লা, মিষ্টান্ন, খেলনা ও কাঠের আসবাবপত্রের পসরা নিয়ে বসেছে অসংখ্য দোকান।
রসগোল্লা ও মিষ্টির দোকানদার আজিজ ইসলাম জানান, “মাটির হাঁড়িতে রসগোল্লা বিক্রি এই মেলার ঐতিহ্য। প্রতি কেজি রসগোল্লা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, আর বালিশ, মাছ ও লাভ মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজিতে।”
মেলায় পাওয়া যাচ্ছে নিমকি, খাজা, মাছ, কদমা, ছাঁচ (হাতি-ঘোড়া), খাগড়াই, বাতাসা ও জিলাপি। দাম নির্ধারণ করা হয়েছে পণ্যের ধরন অনুযায়ী— কদমা, হাতি-ঘোড়া ছাঁচ, বাতাসা ও খাগড়াই ১৮০ টাকা, জিলাপি ১৩০ টাকা ও মুড়কি ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিনোদনের জন্য রয়েছে সার্কাস ও হোন্ডা খেলা, যা শিশু-কিশোরদের মাঝে আলাদা আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, “প্রায় ৪০০ বছর আগে ‘শিবসাগর’ নামে ১৮ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর খনন করে এক হিন্দু জমিদার শিবপূজার মাধ্যমে এই মেলার গোড়াপত্তন করেন। পূর্বে চড়ক পূজাও হতো, তবে এখন শুধুমাত্র শীতলা মন্দিরে পূজা হয়।”
দেউলী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, “মেলার দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে চিরায়ত রীতিই অনুসরণ করা হয়েছে। মেলা ঘিরে পারিবারিক মিলনমেলার আবহ সৃষ্টি হয়েছে।”
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, “মেলাটি পরিদর্শন করা হয়েছে। সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সার্বিকভাবে উপজেলায় উৎসবের আবহ বিরাজ করছে।”
চার শতকের ঐতিহ্য বুকে ধারণ করা এই গাংনগর মেলা এখনও মানুষের স্মৃতিতে আনন্দ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
Leave a Reply