ডেক্স নিউজ :
ইসরায়েলের লাগাতার সামরিক অভিযানে গাজা উপত্যকার মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ মাত্রা লাভ করেছে। শিশু ও সাধারণ মানুষের লাশে ছেয়ে যাচ্ছে পথঘাট, খাদ্যের সন্ধানে গুলিতে ঝরছে প্রাণ। জাতিসংঘ বলছে, গাজা এখন “শিশুদের কবরস্থান” ও “অনাহারের উপত্যকা”।
শুক্রবার (১১ জুলাই) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর কমিশনার-জেনারেল ফিলিপ ল্যাজারিনি বলেন, “ইসরায়েল গাজায় একটি নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের ফাঁদ তৈরি করেছে। মানুষ এখন দুটি পথের সামনে—ক্ষুধায় মারা যাওয়া অথবা গুলিতে প্রাণ হারানো।”
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত খাদ্য সহায়তা নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮১৯ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে ৬৩৪ জনই নিহত হয়েছেন মার্কিন ও ইসরায়েল সমর্থিত এনজিও জিএইচএফ পরিচালিত বিতরণকেন্দ্রগুলোর আশপাশে।
শুক্রবার গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় খাবারের লাইনে থাকা অবস্থায় ১৫ জন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়; নিহতদের মধ্যে ৯ জন শিশু ও ৪ জন নারী। একই দিনে রাফাহ শহরে সহায়তা নিতে গিয়ে মারা যান আরও অন্তত ১১ জন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র রবিনা শামদাসানি জানিয়েছেন, মে থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শুধুমাত্র খাদ্যের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৯৮ জন।
এদিকে, ইসরায়েলি সেনা ও মার্কিন ঠিকাদাররা স্বীকার করেছেন, তারা কখনও কখনও নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করেছেন, যারা শুধু খাবারের আশায় জড়ো হয়েছিলেন। এই তথ্য প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) উপপ্রধান কার্ল স্কাউ বলেন, “গাজায় যা ঘটছে তা আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট। খাদ্য মজুদ থাকা সত্ত্বেও ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে না দেওয়ায় মানুষ বাধ্য হচ্ছে বিতর্কিত বিতরণকেন্দ্রগুলোতে ভিড় করতে।”
অন্যদিকে, ইসরায়েল ‘মানবিক শহর’ গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে, যেখানে তারা গাজার বাসিন্দাদের স্থানান্তর করতে চায়। বিশ্লেষকরা একে আরেকটি ‘নাকবা’ (১৯৪৮ সালের গণবিপর্যয়) সৃষ্টি করার পরিকল্পনা বলে মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল লেভি বলেন, “জিএইচএফ-এর সহায়তা কেন্দ্রগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে ফিলিস্তিনিরা বাধ্য হয় রাফাহ অভিমুখে যেতে। এটি যেন আরেকটি নাকবারের পুনরাবৃত্তি।”
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাফাহ শহরের বিস্তীর্ণ অংশ ইতোমধ্যেই ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাতজ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এখানেই গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষকে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুক্রবার ইসরায়েলি হামলায় জাবালিয়া এলাকায় আশ্রয় নেওয়া একটি স্কুলে ৮ জন নিহত হন। স্কুলটি বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। একই দিনে তুফাহ এলাকায় একটি বাড়িতে হামলায় এক শিশু নিহত হয়।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে হাসপাতাল কার্যত অচল। জরুরি সেবাও বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সের বদলে গরুর গাড়ি ও পশুবাহনে আহতদের স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক বলেন, “মানবিক সহায়তা অবরুদ্ধ থাকায় প্রতিদিন শিশু ও সাধারণ মানুষ ক্ষুধা ও গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছে। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ছাড়া এই মৃত্যুযাত্রা থামানো সম্ভব নয়।”
গাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বের বিবেক যখন প্রশ্নের মুখে, তখন মানবতাবিরোধী এ অপরাধ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ কোথায়—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মানবতা সচেতন প্রতিটি মানুষের মনে।
Leave a Reply