আর্ন্তজাতিক ডেক্স :
গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে থাকা ইসরায়েল এখন নতুন কূটনৈতিক মিত্র খুঁজতে মরিয়া। প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেশটি নজর দিয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের দিকে। পুরোনো সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও নতুন বন্ধুত্ব গড়া—এখনই তেলআবিবের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
সম্প্রতি দীর্ঘ ৫২ বছর পর জাম্বিয়ায় ইসরায়েলি দূতাবাস পুনরায় চালুর মধ্য দিয়ে আফ্রিকায় ইসরায়েলের প্রত্যাবর্তনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার বলেন, “জাম্বিয়ায় ফিরছে ইসরায়েল, আফ্রিকায় ফিরছে ইসরায়েল।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজার যুদ্ধের সময় দক্ষিণ আফ্রিকা যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার অভিযোগ তোলে, তখন জাম্বিয়ার মতো দেশকে পাশে টেনে আফ্রিকায় প্রভাবের ভারসাম্য পাল্টাতে চাইছে তেলআবিব।
জাম্বিয়ার পর ইসরায়েলি কূটনীতিকদের সফরও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদানসহ একাধিক দেশে সফর করেছেন ইসরায়েলি উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হাসকেল। নাইজেরিয়া সফরের পর সেখানে ফিলিস্তিনি কমিউনিটির এক নেতাকে আটক করা হয়, যদিও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ স্পষ্ট নয়। দক্ষিণ সুদানে গিয়ে দেশটির মানবিক সংকটে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন হাসকেল।
তবে এ সময় ফাঁস হয় এক বিতর্কিত পরিকল্পনা—গাজার ফিলিস্তিনিদের জোর করে দক্ষিণ সুদানে স্থানান্তরের সম্ভাব্য উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এমন পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হয় সোমালিল্যান্ডকেও, যেখানে পুনর্বাসনের বিনিময়ে দেশটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু দেশটির জনগণ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।
আফ্রিকার সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে বহু নতুন স্বাধীন আফ্রিকান দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর বেশিরভাগ দেশ সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে। বর্তমানে আবারও ইসরায়েল পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলো—ইথিওপিয়া, উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান, কেনিয়া ও জাম্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় হয়েছে।
২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তা সংস্থা ‘মাশাভ’ এসব দেশে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি সামরিক ও নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রির মাধ্যমে আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার করছে ইসরায়েল। ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও উগান্ডা ইসরায়েলের কাছ থেকে অস্ত্র কিনছে—গাজার আগ্রাসনের সমালোচনা সত্ত্বেও এসব চুক্তি অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আর্থিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় থাকা আফ্রিকান দেশগুলোর দুর্বলতাকে ইসরায়েল কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে। যেমন ২০২০ সালে ঋণ খেলাপি হওয়া জাম্বিয়ায় দূতাবাস পুনরায় চালু করে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে তেলআবিব।
তবে অনেকে এই কূটনৈতিক তৎপরতাকে আফ্রিকায় বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। গাজার যুদ্ধ শুরুর পর অধিকাংশ আফ্রিকান দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে থাকলেও, জাম্বিয়া ও দক্ষিণ সুদান জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসরায়েলের কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই ফল।
জোহানেসবার্গভিত্তিক সংহতি সংগঠন ‘আফ্রিকা ফর ফিলিস্তিন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ দেসাই বলেন, “ইসরায়েলের এই কৌশল আফ্রিকার জনগণের প্রতিরোধে ব্যর্থ হবে। সরকার হয়তো সমর্থন দেবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ একদিন তাদের থামিয়ে দেবে।”
আফ্রিকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেনেভা ফুরিওর মতে, “যেসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, তারা মানবিক কারণ নয়, বরং সামরিক সহায়তা ও বিনিয়োগের প্রলোভনে আকৃষ্ট হচ্ছে।”
Leave a Reply