জাতীয় গড়ের তুলনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তাদের অংশগ্রহণ ও অগ্রাধিকার এখনো সীমিত—ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় এমন চিত্র উঠে এসেছে। আইন–নীতিমালায় আদিবাসীবান্ধব দিকনির্দেশনার অভাব, জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া, তথ্যপ্রাপ্তির ঘাটতি, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা ও অভিযোগ ব্যবস্থার প্রতি অনীহা—এসব কারণে তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মঙ্গলবার রাজধানীর টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, দেশের পাঁচটি প্রধান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যোগ্য আদিবাসীদের মধ্যে আবেদনকারী ও নির্বাচিত ব্যক্তির গড় হার মাত্র ১৯.৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন যোগ্য আদিবাসীর মধ্যে মাত্র একজন তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
বয়স্কভাতা: আবেদন ৫২.১%, নির্বাচিত ২১.২%
বিধবা/স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা: আবেদন ৩৩.৩%, নির্বাচিত ১২%
প্রতিবন্ধী ভাতা/উপবৃত্তি: আবেদন ৫৭.৫%, নির্বাচিত ৩১.৬%
মা-শিশু সহায়তা ভাতা: আবেদন ৩০.৫%, নির্বাচিত ২১.৫%
ভিডব্লিউবি কার্ড: আবেদন ২৫.১%, নির্বাচিত ১২.৪%
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বৈষম্য কমিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাই শান্তির মূল শর্ত। অথচ গবেষণার তথ্য প্রমাণ করে, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সেই ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়নি। “প্রান্তিকের মধ্যেও তারা আরও প্রান্তিক অবস্থায় আছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সুশাসন ও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। দেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা থাকলেও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় মূল ভূমিকা সেনাবাহিনীর। “বাংলাদেশের কোনো সরকারের হাতে নয়—শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি সেনাবাহিনীর হাতেই রয়েছে বলে আমি মনে করি,” মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণা উপস্থাপন করেন গবেষণা দলের প্রধান রাজিয়া সুলতানা। অনুষ্ঠানে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণা অনুসারে, সমতলের আদিবাসীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা প্রচারণা সীমিত, জনপ্রতিনিধিত্ব দুর্বল এবং শিক্ষা–প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে পার্বত্য এলাকায় আলাদা কর্মসূচির অভাব, ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষাগত সমস্যা ও তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা তাদের অন্তর্ভুক্তিকে আরও কমিয়ে দিয়েছে।
টিআইবি বলছে, আদিবাসীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে নীতিমালা সংস্কার, ভাষাগত সহায়তা, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা, এবং সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
Leave a Reply