পিলখানায় সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনের চূড়ান্ত খসড়া প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তর করেছে। প্রতিবেদনে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘটানো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্কের নানা তথ্য উঠে এসেছে। ওই ঘটনায় মোট ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।
তদন্ত কমিশনের ৩৬০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ কিছু নেতা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন। এই তথ্য মেজর (অব.) নাসিরের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে।
তদন্তে জানা যায়, ২০০৮ সালের জুন মাসে মেজর নাসির বরিশালের ডিজিএফআইয়ের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুস সালামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং পরে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের সময় মেজর নাসির দুইটি বই উপহার দেন এবং জানান, তিনি সম্প্রতি বিদেশ থেকে ফিরেছেন এবং একই সময় ভারতের বারাসাতে একটি বৈঠকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে উপস্থিত নেতারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করেছেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, আগামী ১২–১৫ বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীকে নৈতিকভাবে দুর্বল করার মাধ্যমে আঘাত হানা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ওই হত্যার পরিকল্পনার বৈঠকে সোহেল তাজের উপস্থিতি ছিল। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুস সালাম বিষয়টি ডিজিএফআইয়ের ডিরেক্টর সিআইবি ব্রিগেডিয়ার বারীকে জানান, কিন্তু তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে লে. কর্নেল সালামকে তিরস্কার করেছিলেন।
২০০৮ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে মেজর নাসির যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং ভারতীয় হাইকমিশনে টুরিস্ট ভিসা আবেদন করেন। হাইকমিশনে তার সঙ্গে মিটিং হয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তখন জানা যায়, Padua-তে বিডিআর ১৬-১৭ জন বিএসএফ সদস্যকে হত্যা করেছে, যা মেজর নাসিরের কাছে গুরুতর উসকানিমূলক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনা-পূর্ব ষড়যন্ত্রে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ এবং শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর ২৪ জনের একটি কিলার গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নানক, মির্জা আজম, ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, লেদার লিটন ও তোরাব আলীর উপস্থিতি ছিল। পরিকল্পনার সঙ্গে তোরাব আলী আপত্তি জানালেও শেখ সেলিম তার বয়সের কারণে বিরোধের প্রয়োজন নেই বলে জানান।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ পিলখানায় হত্যাকাণ্ডের দিনে সকাল পৌনে ১০টার দিকে সাবেক এমপি মোর্শেদ ও শেখ সেলিম কিছু ‘র’-এর সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। সাবেক এমপি গোলাম রেজা সাক্ষ্য দেন, তিনি নর্দান মেডিকেল কলেজে গিয়ে আলাউদ্দিন নাসিম, সাবেক এমপি মোর্শেদ, শেখ সেলিম এবং ‘র’-এর চার-পাঁচজনকে দেখেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মেজর নাসির, লে. কর্নেল সালাম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্রের মধ্যে সংঘটিত বৈঠক ও যোগাযোগের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ও পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল। তদন্তের সূত্রে উঠে এসেছে যে, রাজনৈতিক ও সামরিক স্তরের বিভিন্ন ব্যক্তির সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক দিক থেকেও পরিকল্পনায় সহায়তা মিলেছিল।
তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, সাক্ষী জবানবন্দি এবং রাজনৈতিক ও সামরিক তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছে। কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তরের মাধ্যমে এখন ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনের হস্তান্তরের মাধ্যমে আশা করা যাচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দোষীদের সনাক্তকরণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। কমিশনের তদন্ত এবং প্রমাণাদির ভিত্তিতে আগামি সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম হবে।
Leave a Reply